বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

এলএনজির দুটি ভাসমান টার্মিনালই অচল, দেশব্যাপী গ্যাসের তীব্র সংকট

আমদানীকৃত এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশনের পর পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দেশে ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) আছে দুটি। সংস্কারজনিত কারণে এর একটি থেকে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে নভেম্বর থেকে। কারিগরি ত্রুটির কারণে গতকাল অন্যটি থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে আকস্মিকভাবেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। আরো তীব্র আকার ধারণ করে দেশব্যাপী বিদ্যমান গ্যাস সংকট। বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকরা।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউটি সংস্কারের জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেটি এরই মধ্যে মেরামত শেষে নিয়ে আসা হলেও চালু করা যায়নি। ব্যাক প্রেসার না থাকায় অন্য টার্মিনাল (সামিট এলএনজি টার্মিনাল) থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। এ টার্মিনালটিও এখন মেরামতের জন্য নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এ অবস্থায় গতকাল সকাল থেকেই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ প্রায় শূন্য হয়ে যায়।

দেশের গ্যাস খাতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। যদিও স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ হয় ৩০০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেটের এফএসআরইউটি বন্ধ থাকায় তা নেমে এসেছিল ২৫০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। সর্বশেষ গত বুধবারও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৫৪ কোটি ঘনফুট। সামিটের এফএসআরইউটি থেকে দিনে সরবরাহ হয় কম-বেশি ৫০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। এ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গতকালের গ্যাস সরবরাহ নেমে আসার কথা ২০০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশিতে। তবে বুধবারের পর পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস সরবরাহের তথ্য আর হালনাগাদ করা হয়নি।

ভাসমান টার্মিনালের সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাস বিতরণও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দ্রুততম সময়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কেজিডিসিএলের বিপণন দক্ষিণ ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ রইস উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএনজি প্রাপ্তি সাপেক্ষে সরবরাহ দেয়া হয়। শুক্রবার সকাল থেকে অনির্ধারিত কারণে সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সংকট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি। রাতের মধ্যেই সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’

যদিও গতকাল রাত দেড়টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কারিগরি ত্রুটির কারণে চট্টগ্রাম এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বলে জানানো হয়। এতে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি রূপান্তরের একটি ভাসমান টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে চট্টগ্রামে সকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অতি দ্রুত মেরামতের কাজ করছে মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, দেশের অন্যান্য এলাকায় শীতের কারণে গ্যাসের স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও কোম্পানিগুলো এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারক করছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

গ্রিডে সরবরাহ কমায় দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকট গতকাল আরো তীব্র হয়ে ওঠে। অনেকটা আকস্মিকভাবেই সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় বা কমে যাওয়ায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন আবাসিক ও শিল্পসহ সব শ্রেণীর গ্রাহক। হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনেও দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ কেজিডিসিএলের বিতরণ এলাকাগুলোয় এ সংকটের তীব্রতা দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি। সংস্থাটির মোট গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখ ১ হাজার ২৮। এর মধ্যে ৯৯ দশমিক ২৯ শতাংশই গৃহস্থালি বা আবাসিক গ্রাহক। এছাড়া শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৮৩৭ বাণিজ্যিক গ্রাহক, শিল্প গ্রাহক ১ হাজার ১৬০, ক্যাপটিভ পাওয়ার গ্রাহক ২০৫, সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্রাহক ৭০, বিদ্যুৎ ছয়, সার কারখানার গ্রাহক চার এবং চা বাগান গ্রাহক দুই। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রধান দুই সার কারখানা ও একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইস্পাত, সিমেন্টসহ বিভিন্ন ভারী শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

গ্যাস সংকটের বিষয়ে এইচএম স্টিলের পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই গ্যাসের সংকট রয়েছে। গত কয়েকদিন গ্যাসের চাপ কম থাকায় আমরা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছি। এভাবে কারখানা চালিয়ে উৎপাদন ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে পণ্যমূল্য খরচ বেড়ে যাবে। গতকাল সকাল থেকে গ্যাস না থাকায় আমাদের মতো অন্যান্য গ্যাসনির্ভর ভারী ইস্পাত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে শুনেছি। গ্যাসের অব্যাহত সংকটের কারণে কেউ কেউ বিকল্প উৎপাদন পদ্ধতির চিন্তাভাবনা করছে। যদিও গ্যাসনির্ভর কারখানা অন্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।’

জানা গেছে, চট্টগ্রামে দৈনিক গড়ে ৪৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সর্বশেষ কয়েকদিন পাওয়া গেছে ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট। গতকাল গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) ও শিকলবাহা-২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) গৌতম চন্দ্র কুণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের গ্যাস বিতরণ প্রায় শতভাগ বন্ধ রয়েছে। সমস্যা সমাধানে পেট্রোবাংলাসহ মন্ত্রণালয় তদারকি করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছে।’

গ্যাস সংকটে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঘরের রান্না থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে ব্যাঘাত ঘটছে বেশ কিছুদিন ধরে। কয়েক সপ্তাহ আগে মেঘনাঘাটের কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে নিয়মিত চাহিদার বিপরীতে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয় কেজিডিসিএল। সারা দেশেই গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এর কম-বেশি প্রভাব দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প-কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় চাপে গ্যাসের সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। এখন এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এর সঙ্গে সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপও বাড়ছে। বিষয়টিকে এখন শিল্প খাতের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরেই গ্যাসের সংকট দেখতে পাচ্ছি। এলএনজি আসার পরও সংকট উত্তরণ হয়নি। একমুখী সরবরাহ চ্যানেলের কারণে কারিগরি ত্রুটিসহ আপৎকালীন গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য খুবই হতাশার।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com